প্রশ্ন: বৈষ্ণব ধর্মমতের উদ্ভব ও বিকাশ বিস্তারিত আলোচনা কর। 211001-16-2018
উত্তর: বৈষ্ণব ধর্ম মূলত বিষ্ণু বা তাঁর অবতারদের (বিশেষ করে কৃষ্ণ) প্রতি ঐকান্তিক ভক্তি ও প্রেমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি একটি প্রাচীন আধ্যাত্মিক ধারা যা মধ্যযুগে বাংলায় শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাবে এক ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রূপ নেয়, যেখানে জাতপাতহীন প্রেমই মুখ্য। নিচে
বৈষ্ণব ধর্মমতের উদ্ভ ও বিকাশ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
এখানে পয়েন্ট আকারে দিলে বেশি মার্ক পাওয়া যাবে,
তাই এখানে পয়েন্ট আকারে দেওয়া হয়েছে।
উৎস ও প্রাচীন পটভূমি: বৈষ্ণব ধর্মের মূল উৎস নিহিত রয়েছে বেদের বিষ্ণু উপাসনা এবং পরবর্তীকালে মহাভারত ও ভগবদ্গীতার বাসুদেব-কৃষ্ণ তত্ত্বে। প্রাচীনকালে এটি ‘ভাগবত ধর্ম’ নামে পরিচিত ছিল, যেখানে ঈশ্বরকে পরম প্রিয় বা সখা হিসেবে কল্পনা করা হতো।
দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলন: খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ ভারতের ‘আলোয়ার’ সন্তদের মাধ্যমে ভক্তিবাদের নবজাগরণ ঘটে। তাঁদের রচিত আধ্যাত্মিক সঙ্গীত ও কাব্য বৈষ্ণব দর্শনকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেয় এবং এটি উত্তর ভারতে সঞ্চারিত হওয়ার পথ তৈরি করে।
শ্রীচৈতন্যদেব ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম: বাংলার বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হলেন শ্রীচৈতন্যদেব। তিনি ষোড়শ শতাব্দীতে নাম-সংকীর্তন এবং ‘অচিন্ত্যভেদাভেদ’ দর্শনের মাধ্যমে এই ধর্মকে নতুন রূপ দেন। তাঁর প্রভাবে ভক্তি ধর্ম কেবল একটি পূজা পদ্ধতি নয়, বরং সামাজিক সাম্যের আন্দোলনে পরিণত হয়।
ষড় গোস্বামীর দার্শনিক ভিত্তি: চৈতন্যের পরবর্তী সময়ে বৃন্দাবনের রূপ, সনাতন ও জীব গোস্বামীসহ ছয়জন পণ্ডিত বৈষ্ণব শাস্ত্র ও ভক্তি-রসের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁদের রচিত গ্রন্থসমূহ গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের আচার, দর্শন ও সাহিত্যকে একটি সুসংবদ্ধ রূপ দান করে।
বৈষ্ণব সাহিত্য ও পদাবলি: জয়দেব, বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের পদাবলি সাহিত্য বৈষ্ণব ধর্মের প্রসারে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার আড়ালে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনের যে ব্যাকুলতা এই সাহিত্যে ফুটে উঠেছে, তা বাংলার সংস্কৃতিকে গভীরভাবে ঋদ্ধ করেছে।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্য: বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর উদারতা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও ‘জীবের দয়া’ এই মতের মূলমন্ত্র। চৈতন্যদেব চণ্ডাল থেকে শুরু করে যবন—সবাইকে কোল দিয়ে প্রেমের মাধ্যমে সমাজ সংস্কার করেছিলেন।
সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও প্রভাব: কালক্রমে বৈষ্ণব ধর্ম বাংলার চিত্রকলা, স্থাপত্য, কীর্তন গান ও উৎসবে স্থায়ী রূপ নেয়। পোড়ামাটির মন্দিরের ফলক থেকে শুরু করে লোকসঙ্গীত পর্যন্ত সর্বত্রই বৈষ্ণবীয় ভাবধারা মিশে আছে, যা আজও বাঙালির আত্মিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরো অন্য উত্তরের জন্য এখানে ক্লিক করুন।
0 মন্তব্যসমূহ